চাঁদপুর, বৃহস্পতিবার, ১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪  |   ২২ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   বিজয়ের মাস ডিসেম্বর শুরু
  •   হাজীগঞ্জের কিউসি টাওয়ারে আগুন :  আহত ১০ 
  •   ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, শূন্যপদ ২৩০৯
  •   করোনার টিকার চতুর্থ ডোজ দেওয়ার সুপারিশ
  •   চাঁদপুর শহরে বিদ্যুৎষ্পৃষ্টে এক যুবকের শরীর জ্বলসে গেছে

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০

কারামাতে ইমামে রাব্বানী (রাঃ)
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

“আলা-ইন্না আউলিয়া আল্লাহে লা-খাওফুন আলাইহিম ওয়ালা হুম ইয়াহ্ জানুন”

(কালামে কাদিম) খোদা ওয়ান্দে কারীম কালামে পাক-এ ফরমান “আউলিয়ায়ে কেরামদের কোন ভয় নেই এবং তাঁরা চিন্তান্বিতও হবেন না (দুনিয়াতে, মউতে, কবরে, হাশরে, মিজানে ও পুলসিরাতে)।” কেননা আল্লাহর অলিদের অন্তরে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারো কোনপ্রকার ভয়-ভীতি নেই। আল্লাহর অলিরা একমাত্র সর্বগুণে সর্বাবস্থায় আল্লাহকেই ভয় করেন।

হাদীসে কুদসীতে আছে- “আল আউলিয়াও তাহ্তা কাবাই লা ইয়ারিফু হুম গাইরি” (আল্লাহর অলিগণ আল্লাহ্ পাকের জুব্বার নিচে থাকেন)। তাঁদের একমাত্র আল্লাহ্ চিনেন, অন্য আর কেউ চিনেন না। তাঁদের বাহ্যিক কার্যের দ্বারা কিছুটা প্রমাণ পাওয়া যায় তারা আল্লাহর অলি এবং কারামাতের দ্বারা আল্লাহর অলিদের সঠিক পরিচয় পাওয়া যায়। এর জন্য হাদীস শরীফে উজ্জল প্রমাণ রয়েছে-“কারামাতুল আউলিয়ায়ে হাক্কুন।" অর্থাৎ আল্লাহ্ পাকের অলিদের কারামাত সত্য।

অন্য হাদীসে আছে আল্লাহর অলিগণ হজ্বের মওসুমে যার যার কবর থেকে বের হয়ে সুপ্ত দেহ নিয়ে হজ্বে অংশ গ্রহণ করেন। এমনিভাবে বিভিন্ন মতে (যোগ্য) কিতাবে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। আল্লাহর অলিগণ জিন্দা, তাঁরা সুপ্ত দেহ নিয়ে কবর শরীফ থেকে বের হয়ে আল্লাহর সৃষ্টি জগতে ভ্রমণ করেন।

আওলাদে রাসূল (দঃ), খলিফাতুর রাসূল, মোজদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত, কাইয়ুমে জামান, শায়খুল মাশায়েখ, পীরে মোকাম্মেল হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব মাওলানা সাইয়্যেদ আবু নছর মোহাম্মদ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল মাদানী (রাঃ)-এর পবিত্র হায়াতে তায়্যেবায়ে অসংখ্য কারামাত বা অলৌকিক ঘটনাবলী সংঘটিত হয়েছে। সমস্ত কারামাত ধারাবাহিকভাবে লিখতে শুরু করলে বিশাল বিশাল কয়েকখানা গ্রন্থ হয়ে যাবে। এখানে ক্ষুদ্র পরিসরে শুধুমাত্র হুজুর কিবলার জীবদ্দশায় ও বর্তমানে আলমে বরযখী জীবনে যা ঘটেছে তার উপর কয়েকখানা কারামাত তুলে ধরা হলো-

* ১৯৮৬ ইংরেজিতে হুজুর কিবলা আল্লামা সাইয়্যেদ আবু নছর মোহাম্মদ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল মাদানী (রাঃ) কুষ্টিয়া জেলায় একটি সুন্নী সম্মেলনে যোগদান করার জন্য রওয়ানা হয়ে পোড়াদহ স্টেশনে পৌঁছলে দেখা গেল, ছাত্র শিবিরের কিছু ছেলেরা হুজুর কিবলার বিরুদ্ধে আপত্তিকর স্লোগান দিতে থাকে। তাঁর সফর সাথী হিসেবে আমি (আইয়ুব আলী আযমী) এবং চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া ছুন্নিয়া আলিয়ার প্রধান মুফতি সাইয়্যেদ অছিউর রহমান সাহেব ছিলেন। আমরা উভয়ে হুজুর কিবলাকে পোড়াদহ স্টেশনে নামতে বারণ করি। কারণ, সেখানে সবাই হুজুর কিবলা তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দুশমন, তাই কোনো অঘটন তারা ঘটাতে পারে। অথচ হুজুর কিবলা কারো কোনো কথা না শুনে সবার আগে পোড়াদহ স্টেশনে নেমে নবীয়ে পাকের দুশমনদের ডেকে বলেন, “হে নবীর দুশমনেরা। এসো, আজ পুনরায় কারবালার ঘটনাকে তাজা করব।” এ বলে হুজুর কিবলা হুঙ্কার দেন। হুজুর কিবলার নূরানী চেহারা ও হালতে যবী দেখে বাতিলপন্থিরা (ছাত্রশিবিরের ছেলেরা) সবাই পালাতে থাকে। ঠিক এমনি মুহূর্তে হুজুর কিবলার ভক্ত মুরীদানগণ সেখানে এসে জমায়েত হতে লাগলেন। অপরদিকে বাতিল পন্থিরা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ১৪৪ ধারা দিয়ে মাহফিল বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। হুজুর কিবলা আমাদের কাছে ঘোষণা দিলেন, “তোমরা কোনো চিন্তা করো না, আল্লাহ্ পাকই আমাদের মাহফিল করার ব্যবস্থা করবেন।” একথা বলেই হুজুর কিবলা একটি হোটেলে অবস্থান করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরে ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই কালীনাথপুর প্রাইমারী স্কুল ময়দানে মাহফিল করার অনুমতি দেন। আমরা সকলে মাহফিলে উপস্থিত হলে দেখা গেলো অপরদিকে আমাদের মাহফিলের পার্শ্ববর্তী স্থানে বাতিল পন্থীরাও মাহফিলের ব্যবস্থা করেছে। মাহফিলে হুজুর কিবলা বাতিল পন্থিদেরকে বাহাছ মোনাযেরা করার জন্য ডাকলে তারা আমাদের মাহফিলে বাহাস মোনাযেরা করার জন্য উপস্থিত হয়। বাতিলপন্থিরা প্রায় বিভিন্ন বিষয়ের উপর ৩২টি প্রশ্ন করে। উল্লেখ্য যে, হুজুর কিবলা উর্দূ ও আরবি ভাষাভাষী ছিলেন বলে বাংলা ভালোভাবে বলতে পারতেন না। তাই ভাংগা ভাংগা বলতে গেলে লোকজনের বুঝতে অসুবিধা হবে মনে করে এক পর্যায়ে আমার (আইয়ুব আলী আযমী) ডান হাতের কনিষ্ট আঙ্গুল ধরে প্রশ্নের জবাব দিতে নির্দেশ দেন। হুজুর কিবলা আমার কনিষ্ট আঙ্গুল ধরার সাথে সাথে যেনো বিদ্যুতের ন্যায় আমার শরীরের মধ্যে ফায়েজ আসতে থাকে আর আমি অনর্গল একটার পর একটা প্রশ্নের জবাব দিতে থাকি। পরিশেষে তারা পরাজয় বরণ করে হুজুর কিবলার কাছে আত্মসমর্পণ করে।

তথ্য দিয়েছেন: মাওলানা আইয়্যুব আলী আযমী সাহেব, মোহাদ্দিছ ছিপাতলী আলিয়া মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম ও শেখ মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, কুন্টিয়ার চর, কুষ্টিয়া।

* হুজুর কিবলা মুর্শিদে বরহক, আওলাদে রাসূল (দঃ), মোজদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব মাওলানা সাইয়্যেদ আবু নছর মোহাম্মদ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল মাদানী (রাঃ) ১৯৮৮ ইংরেজিতে ইন্তেকাল করেন। হুজুর কিবলার ইন্তেকালের ১ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৯ ইংরেজিতে আমি (আঃ রহমান আল-কাদেরী) বায়তুল্লাহ ও যেয়ারতে মদিনা পালন করতে যাই। আমার সাথে চট্টগ্রাম ছিপাতলী আলিয়া মাদ্রাসার মোহাদ্দিছ হযরতুল আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক শাহ্ সাহেব ছিলেন। আমরা উভয়ে মিনাতে অবস্থিত একটি মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য গেলে আমরা সেখানে আমাদের হুজুর কিবলাকে (আবিদ শাহ (রাঃ)) দেখতে পাই। অথচ তিনি এক বৎসর পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন। আমি আশ্চর্য হয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকি আর মনে মনে ভাবতে লাগলাম যে, হুজুর কিবলাতো গত বৎসর ইন্তেকাল করেছেন, আজ এ জায়গায় কেমন করে হুজুর কিবলাকে দেখতে পাচ্ছি? হঠাৎ করে স্মরণ হয়ে যায় যে, আল্লাহর অলিগণ জিন্দা। আর এটা হুজুর কিবলার বিশেষ কারামাত মনে করে আমার সাথী মুফতী আবদুল মালেক শাহ্ সাহেবকে অবহিত করে হুজুর কিবলাকে দেখালাম। আমরা উভয়ে একধরনের উন্মাদের মতো হয়ে হুজুর কিবলার দর্শনের জন্য অগ্রসর হতে থাকি। আর দেখতে লাগলাম যে, হুজুর কিবলা মাথা মোবারক হতে পাগড়ী মোবারক নামাচ্ছেন এবং ডান হাতের আস্তিন মোবারক তুলে একটি তাবিজ উপরের দিকে তুলছেন। যে তাবিজটি হুজুরের জীবদ্দশায় ডান হাতের মধ্যে ছিল। প্রচণ্ড লোকের ভিড়ের কারণে সামনে অগ্রসর হতে আমাদের বিলম্ব হয়ে যায়; আর মুহূর্তের মধ্যেই হুজুর কিবলা আমাদের দৃষ্টিশক্তি হতে হারিয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও হুজুর কিবলার দর্শন পেলাম না।

তথ্য দিয়েছেন: আলহাজ্ব মাওলানা হাফেজ কারী আবদুর রহমান আল্ কাদেরী, চট্টগ্রাম।

* ১৯৭৯ ইংরেজিতে বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার মাধবদী নামক স্থানে এক বিশাল সুন্নী সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। উক্ত মাহফিলে দেশের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামগণ উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ করে শায়খুল হাদীস হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব মাওলানা ফজলুল করীম নক্শবন্দী (রহঃ) ও হযরতুল আল্লামা মুফতী ওবাইদুল মোস্তফা সাহেব মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন। হাজার হাজার জনসাধারণের সমাবেশে উক্ত মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন আওলাদে রাসূল, আমাদের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদে কিবলা সাইয়্যেদ আবু নছর মোহাম্মদ আবেদ শাহ্ মোজাদ্দেদী আল মাদানী (রাঃ)। মাহফিল চলাকালীন সময়ে হঠাৎ করে দেখা গেল আকাশে প্রচণ্ড মেঘ, ঝড় তুফানের ভীষণ আলামত পাওয়া যাচ্ছে। এমতাবস্থায় হুজুর কিবলাকে বৃষ্টির কথা অবহিত করলে হুজুর কিবলা যথানিয়মে মাহফিল পরিচালনা করার নির্দেশ দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। কিন্তু মাহফিলের প্যান্ডেলের ভিতর এক ফোঁটাও বৃষ্টির পানি পড়েনি। এ অবস্থা দেখে সেদিন হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান হুজুর কিবলার কাছে বায়া'তে রাসূল (দঃ) হন।

তথ্য দিয়েছেন: মুফতি ওবায়দুল মোস্তফা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

* ১৯৮৫ ইংরেজিতে হুজুর কিবলাসহ বরিশালের টরকী নামক স্থানে এক বিশাল সুন্নী সমাবেশে নদীপথে যাওয়ার প্রাক্কালে ঝড়-তুফান শুরু হয়। এক পর্যায়ে প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের আক্রমণে লঞ্চ ডুবে যাওয়ার উপক্রম হলে হুজুর কিব্লা পানিতে অবস্থানকারী হযরত খিজির (আঃ)-কে আহ্বান করে কি যেন বললেন। আর মুহূর্তের মধ্যে ঝড়-তুফান বন্ধ হয়ে যায়। পরে নির্দিষ্ট সময়ে আমরা হুজুর কিবলাসহ মাহফিলে উপস্থিত হই।

তথ্য দিয়েছেন: মৌঃ রমজান আলী দরবেশ, হাজীগঞ্জ।

* ১৯৮৮ ইংরেজিতে হুজুর কিবলার ইন্তেকালের পূর্ব মুহূর্তে হযরতুল আল্লামা আল্হাজ্ব মাওলানা খাজা তৈয়্যবুল ইসলামসহ অসংখ্য ওলামায়ে কেরাম ও ভক্ত মুরীদান অধৈর্য্যের মধ্যে অপেক্ষা করছে যে, না জানি কখন হুজুর কিবলা আমাদের ছেড়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। দেখতে দেখতে হঠাৎ করে হুজুর কিবলা উপস্থিত সকলের প্রতি লক্ষ্য করে বলেন- “তোমরা সকলে আদব সহকারে সালাত ও সালাম পাঠ করো, আল্লাহর হাবীব (দঃ) তাশরীফ মোবারক এনেছেন।” ঠিক এমনি মুহূর্তে আমরা সকলে অনুভব করলাম মেশকে আম্বরের খুশবু বের হচ্ছে, সমস্ত ঘর নূরে আলোকিত হয়েছে আর মুহূর্তের মধ্যেই হুজুর কিবলা আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)।

তথ্য দিয়াছেন: বর্তমান মুর্শিদ কিবলা, হাজিগঞ্জ, চাঁদপুর।

* ১৯৬২ ইংরেজিতে ১৬ই মার্চ মুর্শিদ কিবলা (রাঃ) একটি জরুরি চিঠি দিয়ে আমাকে (মাওঃ মমতাজ উদ্দিন আবেদী ) লাকসাম গাজীমুড়া আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জনাব মাওলানা আবদুল মজিদ সাহেবের নিকট পাঠালেন। চিঠিখানা আমি পৌঁছিয়ে দিয়ে ফেরার পথে লাকসাম স্টেশনে পৌঁছে ভুলবশতঃ আমি চট্টগ্রামের ট্রেনে উঠেপড়ি। ট্রেনটি ছাড়ার কিছুক্ষণ পর আমি বুঝতে পারলাম এটা চট্টগ্রামগ্রামী ট্রেন; তাই আমি ট্রেন থেকে নেমে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলাম। একপর্যায়ে ট্রেন থেকে লাফ দেয়ার জন্য প্রস্তুত হলে একজন লোক আমাকে ধরে ফেলে। আমি কোনো উপায় না দেখে মুর্শিদ কিবলাকে চিৎকার দিয়ে ডাকতে শুরু করি। কিছুক্ষণ পরেই দেখি ট্রেনটি ক্রমেই থেমে গেল; আর আমি এ সুযোগে ট্রেন হতে নেমে পুনরায় লাকসাম স্টেশনে ফিরে আসি। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই চাঁদপুরের ট্রেন আসলে আমি সে ট্রেনযোগে সরাসরি দরবার শরীফে আসি। তখন রাত হয়ে গেছে। দরজায় আওয়াজ দিতেই মুর্শিদ কিবলা বলে উঠলেন, “কোন্ হ্যায়?” আমি বললাম, “হুজুর হাম মমতাজ।” হুজুর কিবলা বললেন, “কিউ ইতনা দের কিয়া?” জবাবে আমি বললাম, “আবতো ছব কুচ জানতে হ্যায়।” হুজুর কিবলা বললেন, “আরে বেয়াকুব! তুমনে কিঁও দের কিয়া, ম্যায় কেয়ছে জানতে হ্যায়?” আমি একই জবাব দিলাম। হুজুর কিবলা বললেন, “নাবালেগ বাচ্চা! তুম আকায়েদমে পড়হা নেহী কারামাতুল আওলিয়ায়ে হাক্কুন। বাচ্চা চিটাগাংকী ট্রেন মে ভুলছে উঠগেয়া তো কিয়া হুয়া? মুঝকো ছোড়দো।” বলেই তিনি দ্রুত চলে গেলেন। আমার শরীর কেঁপে উঠল ও উপলব্ধি করলাম মুর্শিদ কিবলা বেলায়েতের এক উজ্জল প্রদীপ।

তথ্য দিয়েছেন: মাওলানা মুহাম্মদ মমতাজ উদ্দীন আবেদী, শাহরাস্তি, চাঁদপুর।

পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, “যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছেন তাদেরকে তোমরা মৃত বলো না; বরং তারা জিন্দা অথচ তা তোমরা অনুধাবন করতে পারছ না।”

হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে শহীদ প্রধানতঃ দুই প্রকার (১) শহীদে আকবর, (২) শহীদে আসগর।

নিজের নফ্সের সহিত জেহাদ করে রাসূলে পাক (দঃ)-এর আদর্শের উপর থেকে যারা জীবনকে অতিবাহিত করেছে তারাই জেহাদে আকবর বা বড় জেহাদ করছে। আর ধর্ম যুদ্ধে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন তারা জেহাদে আজগর বা ছোট জেহাদ করেছেন। উল্লেখ্য যে, আমাদের হুজুর কিবলা ইমামে রাব্বানী (রাঃ)-এর ইন্তেকালের ১১ মাস ১৩ দিন পর রওজা শরীফের কাজ করার জন্য যখন তাঁর কবর শরীফ খোলা হয়, সেখানে দেখা গেল দীর্ঘ ১১ মাস ১৩ দিন পরেও হুজুর কিবলার কাফন মোবারকে মাটির কোনরূপ দাগ পড়েনি এবং হুজুর কিবলার চুল ও দাঁড়ী মোবারকসহ সম্পূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অক্ষত অবস্থায় রয়েছে এবং রওজা শরীফ হতে নূরের জ্যোতী ও মেশকে আম্বরের খুশবো বের হচ্ছিল।

* ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে চরম সংঘর্ষ বাঁধে তখন পাঞ্জাবী সৈন্যদের কাছে শত্রুপক্ষ ইমামে রাব্বানী (রাঃ) সম্বন্ধে মিথ্যা রিপোর্ট লেখায়। তারা ইমামে রাব্বানী (রাঃ) ও তাঁর মসজিদের নয়জন মুসল্লিকে বন্দী করে। ইমামে রাব্বানী (রাঃ)সহ নয়জনকে গুলি করার জন্য নদীর পাড়ে নিয়ে লাইনে দাঁড় করায়। লাইনের প্রথমে রাখা হয় ইমামে রাব্বানী (রাঃ) সাহেবকে। আল্লাহ্ ও রাসূল (দঃ)-এর অশেষ মেহেরবানীতে যে রাইফেল দিয়েই গুলি করার জন্য উঠানো হয় সে রাইফেলই অকেঁজো হয়ে যায়। এভাবে বেশ কয়েকটি রাইফেল দিয়ে চেষ্টা করার পরও ব্যর্থ হয়, কোনো রাইফেল দিয়েই গুলি বের হয় না। তখন পাঞ্জাবী কমান্ডার ইমামে রাব্বানী (রাঃ) সাহেবকে যাদুকর বলে (নাউজুবিল্লাহ) এবং লাইন হতে সরাবার নির্দেশ দেয়। তাঁকে লাইন হতে সরাবার পর বাকি নয়জনকে তারা গুলি করে শহীদ করে।

তথ্য দিয়েছেন: মোহাম্মদ শাহজাহান, মনিনাগ, হাজিগঞ্জ, চাঁদপুর।

* ১৯৮৫ ইংরেজির কথা। ভৈরবের হাজী সিরাজ মিয়ার শত্রুপক্ষ হিংসার বশীভূত হয়ে তার নামে মার্ডার কেইস করে। এমতাবস্থায় সে পর পর ২টি মার্ডার কেইসের আসামী। উকিল মোক্তারের কাছে গিয়ে হাজার হাজার টাকাণ্ডপয়সা খরচ করে, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। অবশেষে তার প্রায় ফাঁসির অর্ডার হয়ে যাবে। এমনি সময় আর কোনো রাস্তা না দেখে হুজুর কিবলার দরবার পাকে আসে। মুর্শিদ কিবলা তাকে ভরসা দিয়ে চলে যেতে বলেন। তার পর পরই সে বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।

* কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর থানায় এক বিশাল সুন্নী সমাবেশে আমাদের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদ কিবলাকে প্রধান অতিথি করে দাওয়াত করা হয়। হুজুর কিব্লা যথাসময়ে মাহফিলে উপস্থিত হলে স্থানীয় বাজার কমিটির সেক্রেটারী মাহফিলে ডিস্টার্ব করে। যার কারণে পরে তার মাথা বিকৃতি হয়ে পাগল হয়ে যায় এবং পথের ভিখারী হয়ে পথে পথে ঘুরে।

তথ্য দিয়েছেন: মোহাম্মদ জজ মিয়া, ভৈরব।

* একদা মুর্শিদ কিবলার জনৈক খাদেম আঃ ছোবহান তাঁর দরবারে হাজির হয়ে বললেন, “হুজুর, আমি নিঃসন্তান। আমার জন্য দোয়া করুন। আল্লাহ্ পাক যেন আমাকে সন্তান দান করেন।” উক্ত খাদেমের বক্তব্য শ্রবণে হুজুর বললেন, “তুমি কয়টি সন্তান চাও?” খাদেম জবাব দিলেন, “আপনার দয়া।” অতঃপর মুর্শিদ কিবলা কিছুক্ষণ মোরাকাবা হালতে থেকে খাদেমকে বললেন, “যাও তোমার চারটি সন্তান হবে।” পরে প্রমাণিত হলো হুজুরের দোয়ার বরকতে উক্ত খাদেম চার সন্তানের পিতা হলেন।

তথ্য দিয়েছেন: মোঃ ছোবাহান মজুমদার, কচুয়া, চাঁদপুর।

* ১৯৭৪ খ্রিঃ সনে আমি (মুফতি অহিদুর রহমান) যখন কামেল সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র ছিলাম, ঢাকা কালীগঞ্জের সোমবাজারে সুন্নী সম্মেলনে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন। সঙ্গে রমজান আলী দরবেশ ছিলেন। সম্মেলন থেকে ট্রেনে ফেরার পথে আমি মুর্শিদ কিবলাকে অনুরোধ করলাম আমার দেশের বাড়িতে যাওয়ার জন্য। তিনি আমাকে বললেন, “তোমার বাড়ি যেতে হলে কোন্ স্টেশনে নামতে হবে আমাকে স্মরণ করে দিও।” আমরা মেইল ট্রেনে ছিলাম, যে ট্রেনের নাম “গ্রিনারো’। আখাউড়া থেকে ছাড়ার পরে কুমিল্লা পর্যন্ত আর কোনো স্টোপিজ নেই। হঠাৎ করে শালদা নদীর কাছে ট্রেন আসার সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদ কিব্লা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বাড়িতে যেতে হলে কোথায় নামতে হবে?” আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম; কেননা মেইল ট্রেন, শালদা নদীর কাছে কোনো স্টোপিজ নেই। মুর্শিদ কিবলা আমার চেহারার দিকে চেয়ে বল্লেন, “ব্যাগ নেও, উঠ, আমাদের নামতে হবে।” এ কথা বলে উনি শাহাদাত আঙ্গুল মোবারক দিয়ে ট্রেনের সিটে টিপ দেন। ট্রেন তৎক্ষণাৎ থেমে গেল। আমরা ট্রেন হতে পায়ে হেঁটে কুল্লা পাথর গ্রামে যাই। রাত্রে কাল যাপন করার পর পরদিন মুর্শিদ কিবলা হাজীগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।

* আমি হুজুর কিবলার কাছে মনের আবেগ প্রকাশ করলাম, “বাবা! গ্রামে রাস্তা-ঘাট নেই, ট্রেনে আসা-যাওয়ার অসুবিধা। আমার জন্য একটু দোয়া করুন। আমি যেন শহরে চলে যেতে পারি।” হুজুর কিবলা কিছুক্ষণ চোখ মোবারক করে বন্ধ করে বল্লেন, “ওয়াহিদুর রহমান! তোমার গ্রামই শহর হয়ে যাবে। তোমার পায়ের নীচে কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এ মাটির নীচে গ্যাস আছে, তৈল আছে, স্বর্ণ আছে; এখানেই থাক।” আমি তখন বললাম, “বাবা আমাকে বাড়ি করার জন্য যে জায়গা দিয়েছে তার চতুর্দিকে খোলা। আপনার মেয়েকে নিয়ে কি করে থাকব?” মুর্শিদ কিবলা পকেটে হাত দিয়ে আমাকে বললেন, “ধর সব ঘর বিল্ডিং করে ফেলবে।” মুর্শিদ কিবলার কথা আজ বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে। আজ থেকে বাইশ বছর আগে আমার প্রাণপ্রিয় মুর্শিদ কিবলা যে স্থান নির্দেশ করে আমাকে বলেছিলেন, “এখানে গ্যাস ও তৈলের খনি আছে।” ঠিক সে স্থানেই গ্যাস ও তৈলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছে (সুবহানাল্লাহ্)। আল্লাহর ওলীদের শান কত মহান।

* ১৯৭৭ খ্রিঃ সনে গাউসে জামান ইমামে রাব্বানী সাইয়্যেদ আবেদ শাহ মোজদ্দেদী আল মাদানী (রাঃ)-এর সঙ্গে কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত ফকির বাজার হাই স্কুলের সামনে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দঃ) মাহফিলে যাই। উক্ত মাহফিলে বহু সুন্নী উলামায়ে কেরাম হাজির ছিল। প্রায় সন্ধ্যা ৭টায় ঝড়-তুফান আরম্ভ হয়। মাহফিল কমিটির সভাপতি হাসান আলী এসে বললেন, “হুজুর, আমরা বহু আশা-ভরসা করে আপনাকে দাওয়াত করেছি। আপনার মূল্যবান ওয়াজ শুনার জন্য বহু দূর-দূরান্ত থেকেও লোক এসেছে। লোকজন কোথায় যাবে?” এ কথা শুনার পর মুর্শিদ কিবলা কিছুক্ষণ চোখ মোবারক বন্ধ করে বল্লেন, “ওয়াহিদুর রহমান যাও ওয়াজের কাজ চালু কর।” অর্থাৎ ওয়াজ করতে যাও। আমি নির্দেশ পেয়ে ওয়াজের মঞ্চে ওয়াজ করতে যাই; কিন্তু ঘর হতে বের হয়ে দেখলাম কোন ঝড়-বৃষ্টি নেই। সারারাত ওয়াজ মাহফিল চলল। এক আশ্চর্য্য বিষয়-সকাল বেলা দেখাগেল ফকির বাজার গ্রাম ব্যতীত চতুর্দিকের গ্রামগুলোতে ঝড়-বৃষ্টিতে অসংখ্য ঘর-বাড়ি, গাছ-পালা নষ্ট হয়ে গেছে। ফকির বাজারে কোনো ঝড়-বৃষ্টি হয়নি; বরং আকাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন (সুবাহানাল্লাহ্)। আল্লাহর অলির কী কারামত! এতে প্রমাণিত হয়, আমাদের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদ কিবলা আল্লাহর প্রিয় বন্ধু ছিলেন।

* কালীগঞ্জ উপজেলার সোমবাজার আবেদীয়া মোজাদ্দেদীয়া খানকা শরীফে আমি উপস্থিত ছিলাম। এমতাবস্থায় বান্দাখোলার বাসিন্দা মাওলানা হাবিবুর রহমান আখন্দ চেহারা বিষন্ন অবস্থায় হাজির হলেন। মাওলানা সাহেব কিছু বলার আগেই মুর্শিদ কিবলা বললেন, “কি মাওলানা? কি চিন্তা করছ? আগামী এক বৎসরের মধ্যেই তোমার স্ত্রীর দু'টি ছেলে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে।” আল্লাহ্পাকের ইচ্ছায় পরের বৎসর ১৯৮২ইং আবার ঐ সোমবাজার সুন্নী সম্মেলনে গিয়ে দেখি, বান্দাখোলার ঐ মাওলানা সাহেব তার দুটি জমজ ছেলে সন্তান নিয়ে মুর্শিদ কিবলার সম্মুখে বসা।

তথ্য দিয়েছেন: মাওলানা মুফতি অহিদুর রহমান আবেদী, কসবা, কুমিল্লা।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়