সোমবার, ২৫ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৮, ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩  |   ২৮ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন, দামে অসন্তুষ্ট কৃষক : সবজি ক্ষেতে সবুজ হাসি থাকলেও কৃষকের মুখ ম্লান
  •   অশুভ শক্তি শক্তিশালী হলেও জয়ি হতে পারবে না : শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি

প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বিদ্যমান রাজনীতির ক্ষেত্রে ভোট শেষ জোটও শেষ

মানুষের কল্যাণে দেশের বা জাতীয় স্বার্থে কাজ করার জন্য জনগণের সমর্থন পেয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়াই হলো রাজনীতি। আর রাজনীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার অন্যতম প্রতিষ্ঠান হলো রাজনৈতিক দল। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আর্নেস্ট বার্কার (ঊৎহবংঃ ইধৎশবৎ)-এর মতে, ‘রাজনৈতিক দল হলো বিশেষ একটি মতাদর্শের দ্বারা পরিচালিত দল, যারা জাতীয় স্বার্থে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচকমণ্ডলীর সমর্থন লাভের চেষ্টা করে।’ আর্নেস্ট বার্কারের মতের সাথে সুর মিলিয়ে রাজনৈতিক জোটের সংজ্ঞার যথার্থতাও পাওয়া যেতে পারে। যখন কতিপয় রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং নিজেদের দলীয় অস্তিত্ব ও নীতি বিসর্জন না দিয়ে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে তখন একটা রাজনৈতিক জোট সৃষ্টি হয়েছে বলা চলে। সাধারণত বহুদলীয় ব্যবস্থায় জাতীয় ক্রান্তিলগ্নে কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার কৌশল হিসেবে একাধিক দলের সমন্বয়ে এ জোট গড়ে উঠে। বিশেষ কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে জোট গঠিত হয় এবং সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সফল বা বিফল যা-ই হোকনা কেন এক সময় তা ভেঙ্গে যায়। আর রাজনৈতিক জোট হিসেবে এ দেশের রাজনৈতিক দলের বিদ্যমান জোটবদ্ধতার কথা ধরলে তারা জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের চাওয়া-পাওয়ার সংগ্রামে কতটুকু সার্থকতা অর্জন করতে পেরেছে সচেতন মহলে তার মূল্যায়ন হচ্ছে। তাই কথা উঠছে, বিদ্যমান রাজনীতির ক্ষেত্রে ভোট শেষ জোটও শেষ ?

বাংলাদেশে রাজনৈতিক জোট গঠনের ইতিহাস নতুন কোনো ঘটনা নয়। বরং বৃটিশ শাসনামলেই এতদঞ্চলে রাজনৈতিক জোট গঠনের সর্বপ্রথম সূত্রপাত ঘটে। তখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বৃটিশ সরকার বিরোধী বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি থেকেই রাজনৈতিক জোটের আবির্ভাব ঘটে। ১৯১৬ সালের ‘লক্ষৌ চুক্তি’, ১৯২৩ সালের ‘বেঙ্গল প্যাকট’, ১৯২০ সালের ‘অসহযোগ আন্দোলন’, ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড় আন্দোলন’ উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এসব ছিল রাজনৈতিক আঁতাতস্বরূপ।

পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়েছে। যেমন : ১৯৫৪ সালের ‘যুক্তফ্রন্ট’, ১৯৬৫ সালের ‘সম্মিলিত বিরোধী দল (ঈঙচ)’, ১৯৬৭ সালের ‘পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন’, ১৯৬৯ সালের ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটি’ এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ প্রভৃতি রাজনৈতিক জোট। প্রতিটি জোটেরই নিজস্ব কর্মসূচি ও আদর্শ ছিল এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে গঠিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার অব্যবহিত পর সমগ্র দেশে আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় বিরোধী নেতৃত্ব হিসেবে মাওলানা ভাসানীর ৭ দলীয় ঐক্যজোট ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয়। জোটের নেতা হিসেবে মাওলানা ভাসানী ১৫ দফা সম্বলিত এক দাবিনামা সরকারের কাছে পেশ করেন। কিন্তু এ জোট বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সেই সময় ‘জাসদ’-এর জন্ম এবং সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফলে ৭ দলীয় জোট দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ, ন্যাপ মোজাফ্ফর ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। এ জোট রাষ্ট্রীয় মৌলনীতির ভিত্তিতে দেশ গড়ার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করে যাবার অঙ্গীকার করে।

১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবার জোট রাজনীতি শুরু হয়। একদিকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ৫টি বিরোধী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’ (গজ) গঠন করা হয়। পক্ষান্তরে ৬টি দল নিয়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ নামে নির্বাচনী আঁতাত গঠন করা হয়। এছাড়াও বয়োবৃদ্ধ জননেতা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে একটি তৃতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়। উক্ত ফ্রন্ট তেমন ভূমিকা পালন করতে পারেনি, তবে পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানকে সমর্থন জ্ঞাপন করে।

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবার জোটবদ্ধ আন্দোলনের তৎপরতা লক্ষ্যণীয়। সামরিক আইনের আওতায় নির্বাচন অনুষ্ঠানকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল প্রহসন হিসেবে গণ্য করে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশ্যে আওয়ামীলীগ ও জাসদ সহ ১০টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ হয়। তবে আওয়ামীলীগ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। ফলে সে ঐক্যে ভাঙ্গন দেখা দেয়। অপরদিকে ১৯৭৯ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সরকার-বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্যে মোহাম্মদ তোয়াহাকে আহ্বায়ক করে ৫টি বামপন্থী দল একটি ঐক্যজোট গঠন করে।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর জাগপা, জাতীয় লীগ ও লেবার পার্টি প্রভৃতি ছোট ছোট ১৪টি দল সমন্বিতভাবে একটি জাতীয় ফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না বলে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি নামে পরিচিত দুই আওয়ামীলীগ (হাসিনা, মিজান), ওয়ার্কাস পার্টি ও জাসদসহ ১০টি বিরোধী দল একত্রিত ও সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন চালনার জন্য দশ দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে। উক্ত দলগুলো একক প্রার্থী মনোনয়ন দানের ব্যাপারে ব্যর্থ হন এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। পক্ষান্তরে জাসদ, কৃষক-শ্রমিক সাম্যবাদী দল ও ওয়ার্কাস পার্টির সমন্বয়ে ‘ত্রি-দলীয় ঐক্যজোট’ গঠন করে একক প্রার্থী হিসেবে এম. এ. জলিলকে নির্বাচনে সমর্থন দেয়। আওয়ামী লীগের পক্ষে ড. কামাল হোসেন এবং বিএনপি থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিজয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে জনগণের মৌলিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণ করলে জনগণ তীব্র প্রতিবাদ জ্ঞাপন করে। আর অবৈধ এরশাদ সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে আন্দোলনকে সুতীব্র করার জন্য আওয়ামীলীগ কর্তৃক সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ১৯৮৩ সালের ১৫ জানুয়ারি একটি যুক্ত বিবৃতি দানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট গঠিত হয়। অন্যদিকে বিএনপি একই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সমমনা দলসমূহ নিয়ে নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াকে মনোনীত করে অপর একটি ৭ দলীয় জোট গঠন করে। এখানে উল্লেখ্য যে, দলগতভাবে বিএনপি ও আওয়ামীলীগের মধ্যে কতকগুলো মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি সর্বদলীয় জোট গঠন করার ক্ষেত্রে। তবে ১৫ দলীয় এবং ৭ দলীয় জোটের যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় দাবি হিসেবে ঐতিহাসিক পাঁচ দফা দাবি উত্থাপিত হয় এবং যুগপৎভাবে আন্দোলন চালাতে থাকে। হরতালসহ সামরিক সরকার বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচি চলতে থাকে। ১৫ দলীয় জোটের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত যেমন আসতে থাকে আওয়ামী লীগ হতে, ঠিক তেমনি ৭ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্ব আসতে থাকে বিএনপি’র নিকট থেকে। ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ জোট আন্দোলনের গতিধারায় আমূল পরিবর্তন আসে। ৭ মে সামরিক শাসনের অধীনে নির্বাচনী সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ১৫ দলীয় জোট দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৫ দলীয় জোটের জাসদসহ বামপন্থী ৫টি দল নির্বাচনকে বয়কট করে আন্দোলন চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অপরপক্ষে আওয়ামী লীগসহ অন্য ৭টি দল ৮ দলীয় জোট নামে ৭ মে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। উল্লেখ্য, ৭ দলীয় জোট নির্বাচন বয়কট করে কিন্তু জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ৩ মার্চ ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় বারের মত সামরিক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে সরকার ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগসহ ৮ দল, বিএনপিসহ ৭ দল ও জাসদসহ ৫ দলীয় জোট ৩ মার্চের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থেকে নির্বাচনকে প্রতিহত করার আহ্বান জানায়। অপরদিকে আ.স.ম. আব্দুর রব ৭০ দলীয় ‘কপ’ গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এ সংসদে আব্দুর রবের ‘কপ’ গুটি কয়েক সদস্য নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে।

তিন জোটের আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়, যা গণঅভ্যুত্থান ঘটায়। তার ফলে ৯০’র ৬ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করেন। তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ উপরাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯১’র ২৭ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেন। নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে, কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি। ফলে জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে।

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬’র ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ এককভাবে বিজয়ী হয়, তবে সরকার গঠনে ৫টি আসন ঘাটতি হয়। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টি ও জাসদ (রব) সরকার গঠনে আওয়ামীলীগকে সমর্থন দেয়। শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভা বা সরকারকে ঐকমত্যের সরকার বলে অভিহিত করেছেন।

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী ২০০১’র ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেন। এ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। উল্লেখ্য, জোটবদ্ধ নির্বাচনই এবারের বিএনপি নেতৃত্বের জোটকে দু-তৃতীয়াংশের অধিক বিজয় প্রদান করেছে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ নভেম্বর ২০০১)।

প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার যথাযথ সময়ে পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন। ফখরুদ্দীন ‘মাইনাস-টু-ফর্মূলা’ গ্রহণ করেন। কিন্তু খালেদা-হাসিনার জনপ্রিয়তার কারণে এটা সম্ভব হয়নি। ২০০৯’র ১৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামীলীগ ১৪ দল ও এরশাদের জাতীয় পার্টি নিয়ে মহাজোট গঠন করে। আর অপরদিকে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীসহ ৪ দলীয় জোট গঠন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এ নির্বাচনে মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যের সরকার গঠিত হয়।

২০১৪’র ৫ জানুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে না হয়ে দলীয় সরকারের অধীনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বিরোধী দল তথা জোটের বয়কট সত্ত্বেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামীলীগ ও তার মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জোট সরকার গঠন করে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেও ব্যাপক আলোচনায় থাকা জোটগুলোর মধ্যে আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটসহ মহাজোট, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট, বিএনপি ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, অধ্যাপক ডাঃ এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার নেতৃত্বাধীন বেশ কয়েকটি নামসর্বস্ব দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট এলায়েন্স (বিএনএ), বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শের ৮টি দলের জোট ‘গণতান্ত্রিক বাম জোট’ ছাড়াও নামসর্বস্ব ছোট ছোট আরও কিছু জোট গড়ে উঠে। ভোটের পর থেকেই জোটবদ্ধ দলগুলোর নেই তেমন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম। এমনকি করোনা মহামারীতেও সাধারণ মানুষের পাশে নেই জোটভিত্তিক এসব রাজনৈতিক দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিও এখন অনেকটাই ‘একলা চলো নীতি’তে চলছে। এর মধ্যে বামপন্থি রাজনৈতিক আদর্শের গণতান্ত্রিক বামজোট রাজপথে মাঝে মাঝে কিছুটা সক্রিয়। এছাড়া অন্যান্য ছোট দল বিলীনের পথে বললে ভুল হবে না।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, রাজনৈতিক জোটগুলো হয় মূলত ভোটকে ঘিরে অথবা দেশের বা জাতীয় বৃহত্তর কোন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশে স্বাধীনতাপূর্ব সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনৈতিক জোট এবং ৯০’র পূর্ব ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাজনৈতিক জোট আর ’৯০ পরবর্তী সময় থেকে রাজনীতিতে ভোটযুদ্ধ হয়ে আসছে। তাই বিদ্যমান রাজনীতিতে বাস্তবতায় দেখা যায় ভোট শেষ জোটও শেষ। আবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে জোটের রাজনীতি দেখা যাবে এমনটাই দেখা যাচ্ছে।

টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলের কাউকে মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। সে কারণে এটাকে পূর্বের মত ঐক্যসরকার না বলে আওয়ামীলীগের সরকার বলছেন জোট শরিকরা। গত বছরের প্রথম থেকে জোটভিত্তিক রাজনৈতিক দৃশ্যমান কর্মসূচিও নেই তাদের। জোট শরিক নেতারা মনে করছেন, একচেটিয়া বিজয়ের পর আওয়ামীলীগ নিজেই শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে। বিএনপিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের ভাবনার কিছু নেই। বিএনপি যে পরিস্থিতিতে পড়েছে তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই তাদের হিমশিম খেতে হবে। তাই শরিকদের পাত্তা দেওয়ার কিছু নেই (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪ জুলাই ’২১)। এ প্রসঙ্গে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ (মোজাফ্ফর)-এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ভোট নেই, তাই এখন জোটের দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। জোটকে যেভাবে সক্রিয় রাখা প্রয়োজন জোট প্রধান আওয়ামীলীগ তা করতে পারেনি।’ এ প্রসঙ্গে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুও বলেন, করোনা, জঙ্গিবাদ এবং দুর্নীতি বন্ধে ১৪ দলীয় জোটকে আরও সক্রিয় করা উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে হেফাজতের তা-বের পর আবারও প্রমাণ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেশ পরিচালনার জন্য অসাম্প্রদায়িক জোটের দরকার আছে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪ জুলাই ’২১)

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই জোট-ফ্রন্টের শরিকদের এড়িয়ে ‘একলা চলো নীতি’ অবস্থানে ‘বিএনপি’। দুই জোটের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই বিএনপি এককভাবে অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এ নিয়ে ২০-দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক ‘নাগরিক ঐক্যের’ আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে দূরত্ব বাড়ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই সরকারকে হটাতে হলে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে ঐক্যবদ্ধভাবেই লড়তে হবে। সেটা বিএনপিকে অনুধাবন করতে হবে।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪ জুলাই ’২১)। ভোটের পর বিএনপি গুটি কয়েক সংসদ সদস্যের শপথ নিয়ে সংসদে যাওয়া, জামায়াত-এলডিপি-কল্যাণ পার্টির সঙ্গে দূরত্বসহ বিএনপি’র একলা চলো নীতিতে হতাশ ২০ দলীয় জোট। ভবিষ্যতে ২০ দলীয় জোট টিকে থাকবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ আছে। এছাড়া বিএনপি আবার নতুন করে বৃহত্তর জোট গড়তে তৎপর। (রাজনীতি মহলের আলোচনা) শেষ পর্যন্ত বিএনপি’র রাজনীতি কোন পথে বা কোন দিকে মোড় নেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বস্তুতঃ রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা গ্রহণ করা বা জনগণের আস্থার ভিত্তিতে সরকার গঠন করা এটা যেমন দেশবাসী বুঝেন তেমনি তারা এটাও বুঝেন যে, বিদ্যমান রাজনীতিতে সরকারের পতন ঘটানোই রাজনীতি নয়। বিরোধী রাজনৈতিক জোট গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, এবারকার আন্দোলন গণতন্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে এবং আন্দোলন শেষে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে এরকম বক্তৃতা গত প্রায় একযুগ ধরেই দিয়েছে। এসব স্লোগানের ফলে সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনার সুযোগটি পর্যন্ত ছিল না। যা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য নয়। আলাপ-আলোচনা এবং আন্দোলন দুটোই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বা সংস্কৃতি। একটি বাদ দিলে অন্যটি উত্তেজনা সৃষ্টি করে সত্য, কিন্তু উদ্দেশ্য সিদ্ধির অনুকূল হয় না। আর এ কারণেই সরকার-বিরোধী আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এও বলা চলে যে, জনবিচ্ছিন্ন কোনো পরিকল্পনা বা আন্দোলনই হালে পানি পেতে পারে না। তবে কোন আন্দোলনই ব্যর্থ হয় না। আপাতত আন্দোলনকে ব্যর্থ মনে হলেও তা আবার চাঙ্গা হয়ে উঠতেও পারে। আজ হোক, কাল হোক সকল ফাঁকি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তকে ছিন্ন করে জনতার রায় প্রতিষ্ঠিত হবেই-পৃথিবীর ইতিহাস এটাই শিক্ষা দেয়।

লেখক পরিচিতি : অধ্যাপক মোঃ হাছান আলী সিকদার, সভাপতি, চাঁদপুর জেলা জাসদ ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রনেতা ;

চাঁদপুর জেলা শিক্ষক নেতা ও রাজনীতি বিশ্লেষক।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়