রোববার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৮ কার্তিক ১৪২৮, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩  |   ৩১ °সে
আজকের পত্রিকা জাতীয়আন্তর্জাতিকরাজনীতিখেলাধুলাবিনোদনঅর্থনীতি শিক্ষা স্বাস্থ্য সারাদেশ ফিচার সম্পাদকীয়
ব্রেকিং নিউজ
  •   হাইমচরে শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন, দামে অসন্তুষ্ট কৃষক : সবজি ক্ষেতে সবুজ হাসি থাকলেও কৃষকের মুখ ম্লান
  •   অশুভ শক্তি শক্তিশালী হলেও জয়ি হতে পারবে না : শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি এমপি

প্রকাশ : ১৪ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০

এক নজরে মুহাম্মাদ (সাঃ)
অনলাইন ডেস্ক

মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্ম : পিতা আবদুল্লাহর মৃত্যুর ৫ মাস পর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী সোমবার, ১২ রবিউল আউয়াল ৫৭০ খ্রিঃ ছোবহেসাদেকের সময় কুরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রে। জন্মের পর প্রথম সাতদিন তিনি নিজ মাতার দুগ্ধ পান করেন। আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবার দুগ্ধ পান করেন ৮ দিন। এরপর ধাত্রীমা হালিমা বিনতে আবি জোয়াহব আস সাদিয়ার দুগ্ধ পান করেন ২ বছর। ২ বছরে দুধ ছাড়ার পরই রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মুখে কথা ফোটে।

১-৫ বছর : ধাত্রী হালিমার ঘরে অবস্থান করেন। হালিমার এক পুত্র আবদুল্লাহ, তিন কন্যা আনিতা, হুযাইফা ও শাইমার সংগে ৪ বছর অতিবাহিত করেন। ৫৭৪ খ্রিঃ মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ৪ বছর বয়সে ছিনাচাক (বক্ষ বিদারণ) হয়।

৬ বছর : ৫৭৬ খ্রিঃ মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ৬ বছর বয়সে মদীনা থেকে ফেরার পথেষ্ঠআবওয়া’ নামক স্থানে মা আমিনা ইন্তিকাল করেন। এ সময় মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পিতার দাসী উম্মে আইমন তাঁকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের নিকট পৌঁছিয়ে দেন।

৬-৭ বছর : দাদা আবদুল মুত্তালিবের নিকট প্রতিপালিত হন মুহাম্মদ (সাঃ)। ৭ বছর বয়সে কাবাঘর মেরামতের জন্যে পাথর বহন করেন।

৮-২৫ বছর : ৫৭৮ খ্রিঃ মুহাম্মদ (সাঃ) এর ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন বয়সে তাঁর দাদার মৃত্যু হয়। তাঁর ১০ বছর বয়সে ২য় বার ছিনাচাক হয়। ১২ বছর ২ মাস ১০ দিন বয়সে চাচা আবু তালিবের সঙ্গে শাম (সিরিয়া) দেশে বাণিজ্যে যান। ১৪ বছর বয়সে ফিজারের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবংষ্ঠহিলফুল ফুজুল’ নামে জনসেবামূলক একটি সংস্থা গঠনে অংশগ্রহণ করেন। ২৪ বছর বয়সে হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর সঙ্গে ২য় বার শাম দেশে বাণিজ্যে যান। ২৫ বছর বয়সে বিবি খাদিজা (রাঃ)-এর মালামাল নিয়ে ৩য় বারের মত শাম দেশে বাণিজ্যে যান। শাম (সিরিয়া) দেশ থেকে আসবার ২ মাস পর ৪০ বছর বয়স্কা বিবি খাদিজাকে (রাঃ) ৫৯৫ খ্রিঃ বিবাহ করেন। তখন রাসূলের (সাঃ) বয়স ২৫ বছর ১০ দিন।

৩৫ বছর : রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর ৩৫ বছর বয়সের সময় কাবাঘর মেরামতের নেতারূপে সকলের সঙ্গে কাজ করেন এবংষ্ঠহাজরে আছওয়াদ’ হাতে নিয়ে যথাস্থানে বসিয়ে এক রক্তক্ষয়ী বিবাদের মীমাংসা করেন। এ সময় তিনি ৫ বছরের আলীকে নিজ ঘরে প্রতিপালনের জন্য আনয়ন করেন।

নবুয়ত লাভ : ২৭ শে রমযান সোমবার, ১ লা ফেব্রুয়ারি ৬১০ খ্রিঃ ৪০ বছর ১ দিন বয়সে হেরা গুহায় মুহাম্মদ (সাঃ) নবুয়ত লাভ করেন। ঐ দিনই ৩ বার তাঁর ছিনা চাক হয়।

মক্কায় ৬১১-১৪ খ্রিঃ : নবুয়তের পর প্রথম ৪ বছর মহানবী (সাঃ) গোপনে এক আল্লাহর প্রতি ঈমানের আহ্বানে আত্মনিয়োগ করেন।

নবুয়তের ৫ ম বর্ষ : ৬১৫ খ্রিঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ১৫ জন সাহাবীকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে অনুমতি দেন।

নবুয়তের ৬ষ্ঠ বর্ষ : ৬১৬ খ্রিঃ হযরত হামজা (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন।

নবুয়তের ৭ম বর্ষ : ৬১৭-৬১৯ খ্রিঃ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) চন্দ্র দ্বিখন্ডিত করে দেখান।

৭ম থেকে ১০ম পর্যš Í: ৩ বছর তিনি সর্বপ্রকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বয়কটের সম্মুখীন হন।

নবুষতের ১০ম বর্ষ : ৬১৯ খ্রিঃ নবুয়তের ১০ম বছরে রমযান মাসে হযরত (সাঃ)-এর চাচা আবু তালিবের মৃত্যু হয়। এর তিনদিন পরই বিবি খাদীজা (রাঃ) ইন্তিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৬৫ বছর। হুজুর (সাঃ) উমারের কন্যা হাফসা ও আবু বকরের কন্যা আয়েশা (রাঃ)কে বিবাহ করেন। ৬ জন লোকের একটি দল মদীনা হতে মক্কায় এসে মুসলমান হন। এ দলের মাধ্যমেই পরের বছর আকাবার বাইয়াত অনুষ্ঠানের পথ সুগম হয়। নবুয়তের ১১শ’ বর্ষ : ৬২০ খ্রিঃ নবুয়তের ১১তম বছরে মহররম মাসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যায়েদকে সঙ্গে নিয়ে দ্বীন প্রচারের জন্য মক্কা হতে ৬০ মাইল দূরে তায়েফ গমন করেন এবং চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হন। আকাবার ১ম ও ২য় বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়।

নবুয়তের ১২ তম বর্ষ : ৬২১ খ্রিঃ এ বছর ২৭ শে রজব’ রাত্রিতে স্বশরীরে ৫২ বছর বয়সে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মেরাজ শরীফ হয়। এ সময় হুজুরের ৪র্থ বার ছিনা চাক হয় এবং ৫ওয়াক্ত নামাজ ফরয হয়।

নবুয়তের ১৩তম বর্ষ : নবুয়তের ১৩তম বছরে হুজুর (সাঃ) সাহাবীগণকে মদীনায় হিজরতের আদেশ দেন। ৮ রবিউল আউয়াল বৃহস্পতিবার জুনের মাঝামাঝি তারিখে হুজুর (সাঃ) নিজেও মদীনায় হিজরত করেন। এ সময় হুজুরের বয়স ছিল ৫৩ বছর। এ বছর হতে পরবর্তীকালে হিজরী সন গণনা শুরু হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দ : ১ হিজরী।

হিজরী ১ম বর্ষ : ৬২২ খ্রিঃ মদীনায় মসজিদে নববী স্থাপন। জুমা নামাজ ফরজ ও কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুকুম নাযিল হয়। এ বছর তিনটি খন্ড যুদ্ধ হয়। আয়েশার (রাঃ) সঙ্গে শাওয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর রুসুমত হয়।

হিজরী ২য় বর্ষ : ৬২৩ খ্রিঃ এ বছর আজান ও সিয়ামের হুকুম নাযিল হয়। ৫টি (গাজওয়া) যুদ্ধ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) নিজে পরিচালনা করেন। (আবোয়া বাওয়াত, বদরে কোবরা, বনি কাইনুকা ও সাবিক) এবং তিনটি সারিয়া মোট ৮টি যুদ্ধ হয়। ফাতিমা (রাঃ)-এর বিবাহ্ ও রুকাইয়ার ইন্তিকাল হয়।

যে সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) নিজে অংশগ্রহণ করেছেন সেগুলোকে গাজওয়া বলে এবং যেখানে সৈন্য পাঠিয়েছেন তাকে সারিয়া বলে।

হিজরী ৩য় বর্ষ : ৬২৪ খৃ . ৩টি গাজওয়া (গাতফান, উহুদ, হামরাউল আসাদ) এবং ২টি সারিয়া মোট ৫টি যুদ্ধ হয়। হযরতের প্রিয় চাচা হামজা (রাঃ) শহীদ হন। হাসান (রাঃ)-এর জন্ম হয়। হাফসা ও জয়নাবকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিবাহ করেন।

হিজরী ৪ র্থ বর্ষ : ৬২৫ খৃ . পর্দার হুকুম হয়। ২টি গাজওয়া যুদ্ধ (বনী নাজির, বদরে ছোগরা) এবং ৪টি সারিয়া খ- যুদ্ধ বা ক্ষুদ্র যুদ্ধাভিযান মোট ৬টি যুদ্ধ হয়। মদ হারাম হওয়ার হুকুম হয়। হোসাইন (রাঃ)-এর জন্ম হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) উম্মে সালামা (রাঃ) কে বিবাহ করেন।

হিজরী ৫ ম বর্ষ : ৬২৬ খৃ . ৫টি গাজওয়া (জাতুররিকা, দাওমাতুল জান্দাল, বনী মোস্তালিক, খন্দক, বনী কোরায়জা) এবং ১টি সারিয়াসহ মোট ৬টি যুদ্ধ হয়। অজু ও তায়াম্মুমের আয়াত নাযিল হয়। জয়নাব বিনতে খুজাইমা ও জোয়াইরিয়া (রাঃ)-কে হুজুর (সাঃ) বিবাহ করেন।

হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষ : ৬২৭ খ্রিঃ এ বছর তিনটি গাজওয়া (বনী লেহইয়ান, গাবা, হোদায়বিয়া) ও ১১টি সারিয়া মোট ১৪টি যুদ্ধ হয়। এ বছরেই বিখ্যাত হোদায়বিয়ার সন্ধি হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিভিন্ন বাদশাহদের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠান।

হিজরী ৭ম বর্ষ : ৬২৮ খ্রিঃ তিনটি গাজওয়া (খায়বার, ওয়াদিয়ে কোবরা, জাতররব) ও ৫টি সারিয়া মোট ৮টি যুদ্ধ হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) উম্মে হাবিবা, সোফিয়া, মারিয়া ও মাইমুনা (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। নাজ্জাশী মুসলমান হন।

হিজরী ৮ম বর্ষ : ৬২৯ খ্রিঃ ৪টি গাজওয়া (মুতা, ফতেহ্ মক্কা, হোনায়েন, তায়েফ) ও ১০টি সারিয়া মোট ১৪টি যুদ্ধ হয়। কা'বা ঘর হতে মূর্তি বিতাড়িত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর পুত্র ইবরাহীমের জন্ম ও তাঁর কন্যা জয়নাবের ইন্তিকাল হয়।

হিজরী ৯ম বর্ষ : ৬৩০ খ্রিঃ ১টি গাজওয়া (তাবুক) এবং তিনটি সারিয়া মোট ৪টি যুদ্ধ হয়। হযরত (সাঃ)-এর কন্যা উম্মে কুলসুম (রাঃ)-এর ইন্তিকাল হয়। হজ্জ ফরয হয়।-

হিজরী ১০ম বর্ষ : ৬৩১ খ্রিঃ ২টি সারিয়া যুদ্ধ হয়। রাসূল (সাঃ)-এর পুত্র ইবরাহীমের ইন্তিকাল হয়। ১ লক্ষ ১৪ হাজার সাহাবীসহ মহানবী (সাঃ) হজ্জ পালন করেন। এটাই তাঁর শেষ হজ্জ। এ বছরই তিনি বিদায় হজ্জের ভাষণ প্রদান করেন।

হিজরী ১১শ বর্ষ : ৬৩২ খ্রিঃ ১টি সারিয়া যুদ্ধ হয়। ২৮ শে সফর বুধবার হুজুর (সাঃ)-এর মাথা ব্যথা ও জ্বর হয়। এ সময় হযরত (সাঃ)-এর স্থলে আবু বকর (রাঃ) ১৭ ওয়াক্ত নামায পড়ান। ১৪ দিন জ্বরাক্রান্ত থাকার পর ৬৩২ খ্রিঃ ১৮ জুন, ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার প্রায় দ্বিপ্রহরের সময় মহানবী (সাঃ) ওফাত প্রাপ্ত হন। ১৩ ই রবিউল আউয়াল মঙ্গলবার দিবাগত রাতে হযরত আয়শা (রাঃ)-এর হুজরাখানায় মহানবী (সাঃ)-কে দাফন করা হয়।

মহানবীর সমগ্র জীবন কাল : ২২, ৩৩০ দিন ৬ ঘন্টার মত।

মহানবীর খলিফাগণ :

(ক) হযরত আবু বকর (রাঃ) বিপদের দিনে ইসলামের প্রকৃত রক্ষাকারী

(খ) হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।

(গ) হযরত ওসমান (রাঃ)-কুরআন শরীফের পুনঃ সংকলক ও প্রচারক।

(ঘ) হযরত আলী (রাঃ) জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সিংহদ্বার।

মহানবী (সাঃ)-এর মক্কা যুগের সংক্ষিপ্ত ঘটনাবলী :

খাদিজার (রাঃ) সাঙ্গে মহানবী (সাঃ)-এর ৫৯৫খ্রিঃ বিবাহ্ কাল হতে ৬১০ খৃষ্টাব্দে নবুয়ত প্রাপ্তি পর্যন্ত জীবনীকারগণ মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু আলোচনা করেননি। মহানবী (সাঃ)-এর যুগের ঘটনাবলী সন তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে মক্কার ঘটনাবলীর যে সকল তারিখ সমন্ধে ঐতিহাসিগণ মোটামুটিভাবে একমত সেগুলো হচ্ছে :

৬১০ খ্রিঃ নবুয়ত প্রাপ্তি

৬১৩ খ্রিঃ প্রকাশ্যে প্রচার শুরু

৬১৫ খ্রিঃ আবিসিনিয়ায় হিজরত

৬১৬ খ্রিঃ বয়কট আরম্ভ

৬১৯ খ্রিঃ বয়কট শেষ, খাদিজা ও আবু তালিবের মৃত্যু, তায়েফ যাত্রা

৬২০ খ্রিঃ মদীনাবাসীদের সাথে প্রথম যোগাযোগ

৬২১ খ্রিঃ আকাবার প্রথম বায়াত

৬২২ খ্রিঃ আকাবার ২য় বায়াত, হিজরত।

মক্কায় যখন এ সকল ঘটনা ঘটছিল তখন কেউই এ সবের সন ও তারিখ লিখে রাখেননি।

মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর শারীরিক গঠন

চেহারা মোবারক : অতিব লাবণ্যময় নূরানী। পূর্ণিমার চাঁদের মত ঝকঝকে। দুধে আলতা মিশ্রণ করলে যে রং হয় হুজুর (সাঃ)-এর গায়ের রং ছিল তেমনি।

আকার : খুব লম্বাও নয়, খুব বেঁটেও নয়, মধ্যম আকৃতির। " তাঁর আগে বা পরে কখনও তাঁর মত সুপুরুষ দুনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেননি। ”

চুল : রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর মাথার চুল ছিল কানের লতি পর্যন্ত কিছুটা কোঁকড়ান ঢেউ খেলান বাবরী ও বাবরী কখনও ঘাড় পর্যন্ত কখনও কানের লতি পর্যন্ত থাকত। তিনি মাথার মধ্যভাগে সিঁথি করতেন। চুলে প্রায়ই তৈল ও আতর মাখতেন। ১৭ / ১৮টি চুল পেকে ছিল। কখনও কখনও খেজাব ব্যবহার করতেন। শেষ বয়সে চুল লালাভ হয়েছিল।

মাথা : নবীজীর মাথা মোবারক আকারে অপেক্ষাকৃত বড় ছিল।

কপাল : প্রশস্ত।

চক্ষু : হুজুর (সাঃ)-এর চক্ষুযুগলের মণি খুব কাল ছিল। সাদা অংশের পাশে ছিল কিঞ্চিৎ রক্তিমাভ। চোখের পাতা ছিল বড় এবং সর্বদা সুরমা লাগানো মত দেখাত।

নাক : অতীব সুন্দর উচ্চ নাসিকা।

দাঁত : অতীব সুন্দর রজতশুভ্র দাঁত ছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর, যা পরস্পর একেবারে মিলিত ছিল না, বরং সামান্য ফাঁকা ফাঁকা ছিল। হাসির সময় মুক্তার মত চমকাত।

ঘাড় : দীর্ঘ মনোরম মাংস, কাঁধের হাড় আকারে বড়।

মোহর : স্কন্দদ্বয়ের মধ্যস্থলে কবুতরের ডিম সদৃশ একটু উঁচু মাংস ছিল। এটাই “ মোহরে নবুয়ত ”। এতে “ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ্ ” লিখিত ছিল। মোহরের ওপর তিলক ও পশম ছিল এবং রং ছিল ঈষৎ লাল।

দাড়ি : লম্বা, ঘন, প্রায় বক্ষ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল।

হাত : হাত ও আংগুলগুলো লম্বা ছিল। হাতের কব্জী হতে কনুই পর্যন্ত পশম ছিল। হাতের তালু ছিল ভরাট ও প্রশস্ত।

বক্ষ : মহানবী (সাঃ)-এর বক্ষ ছিল কিছুটা উচু ও বীর বাহাদুরের মত প্রশস্ত। বক্ষস্থল হতে নাভি পর্যন্ত চুলের সরু একটা রেখা ছিল। এ ছাড়া সর্ব শরীর পশমে ভরা ছিল।

পেট : হুজুর (সাঃ)-এর পেট মোটা কিংবা ভুড়ি ছিল না। সুন্দর সমান ছিল।

পদদ্বয় : সুগঠিত উরু ও পদদ্বয়। পায়ের গোড়ালিদ্বয় পাতলা ছিল। পায়ের তালুর মধ্যভাগে কিছু খালি ছিল। চলার সময় সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে মাটির দিকে দৃষ্টিপাত করে হাঁটতেন। পদক্ষেপ দ্রুত ছিল।

চামড়া : শরীরের চামড়া রেশম থেকেও অধিক মসৃণ ও নরম ছিল।

ঘাম : রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর শরীরে ঘাম উঠলে ঘামের বিন্দুগুলো মতির মত চমকাত। ঘাম ছিল অত্যন্ত সুগন্ধযুক্ত।

শরীর : তিনি অত্যন্ত স্থুলও ছিলেন না, অত্যন্ত ক্ষীণকায়ও ছিলেন না। তাঁর গম্ভীর চেহারা দেখলে হৃদয় প্রভাবিত হত। মহাপুরুষের যাবতীয় লক্ষণই মহানবী (সাঃ)-এর পবিত্র দেহে বর্তমান ছিল।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সম্পর্কে অন্যান্য তথ্য :

হুজুর (সাঃ)-এর প্রিয় বস্তু : তিনি ফুল খুব ভালবাসতেন এবং মেয়েদের অতিশয় স্নেহ করতেন। সুগন্ধি ও মধু ছিল তাঁর অতি প্রিয়। বর্ণিত আছে, তিনিষ্ঠ নাভেরা ' নামক সুগন্ধি ব্যবহার করতেন।

আহার্য ও পোশাক :

অনেক সময় তিনি ক্ষুধা বরদাশত করতেন। তিনি ছিলেন অত্যাধিক সিয়াম পালনকারী। তিনি কখনও পেট পুরে আহার করেননি। খাদ্যের প্রাচুর্যের প্রতি তাঁর যেমন বিরাগ ছিল, পোশাকের বেলায়ও তেমনি।

স্বভাব ও আচরণ : জ্ঞানে সর্বশ্রেষ্ঠ, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, পরিজনের কাছে সবচাইতে ভালমানুষি, দরিদ্র ও অসহায়ের বন্ধু। আদর্শ স্বামী ও আদর্শ পিতা। জানাযার পিছনে পিছনে গমন করতেন। জ্ঞানীদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা ছিল। কখনও কখনও হাস্য রসিকতা করতেন। কুরআনই তাঁর চরিত্র। আত্মীয়তার দাবী সম্পর্কে তিনি ছিলেন খুব সজাগ। তিনি ছিলেন সর্বাধিক দাতা, সর্বাপেক্ষা বড় বীর, আবার খোদার সামনে সর্বাধিক ভীতু ও পরহেজগার। হুযুর (সাঃ) ছিলেন প্রাচুর্যের প্রতি বিরাগী। যে বিছানায় তিনি ঘুমাতেন তা ছিল চামড়ার এবং খেজুরের বাকল ও পাতা দিয়ে তৈরি।

হযরত (সাঃ) সম্বন্ধে একটি হাদীস :

হযরত আলী (রাঃ) এক হাদীসে উল্লেখ করেছেন, হুযুর (সাঃ) বলেছেন, “ মারিফত আমার মূলধন, বিবেক আমার দ্বীনের মূলনীতি, প্রেম ও মহব্বত আমার ভিত্তিমূল, আকাংখা আমার সওয়ারী, যিকরুল্লাহ আমার প্রিয় সংগী, বিশ্বস্ততা আমার ভা-ার, ভীতিমূলক চিন্তা আমার বন্ধু, জ্ঞান (ইলম) আমার শোধনকারী, সহিষ্ণুতা আমার চাদর, সন্তুষ্টি আমার প্রতি আল্লাহপ্রদত্ত দান, দারিদ্র্য আমার গৌরব, প্রাচুর্যের প্রতি বিরাগ আমার নৈপুণ্য, দৃঢ় বিশ্বাস আমার কথা, সত্যবাদিতা আমার দোস্ত, ইবাদত আমার আভিজাত্য, জিহাদ আমার প্রকৃতি, আর সালাতেই আমার চোখের শীতলতা " (তথ্যঃ কাজী আইয়ায-এর “ শিফা ” গ্রন্থ।)

দায়িত্ব ও কর্তব্যপালন : সবার আগে সালাম দিতেন। মেহমানদেরকে কিছুদূর পথ এগিয়ে দিতেন। খুশী মনে সকলের দাওয়াত কবুল করতেন। দাওয়াত প্রদানকারীর অনুমতি ব্যতিরেকে কাউকেও সংগে নিতেন না। অনুমতি ব্যতীত কারো ঘরে প্রবেশ করতেন না। যাবতীয় ফায়সালা মসজিদে বসে করতেন। কখনও আমানত নষ্ট করেননি। শিশুদের ভালবাসতেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংগীদের সংগে পরামর্শ করতেন। বাল্যকালে বকরী চরিয়েছেন। যৌবনে ব্যবসা করেছেন। তাওহীদ প্রচারই শ্রেষ্ঠ কর্তব্য মনে করতেন।

মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে কতিপয় কথা :

বিশুদ্ধ হাদীস সমূহে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম (সাঃ)-এর ভুমিষ্ঠ হওয়ার সময় তাঁর স্নেহময়ী জননীর উদর হতে এমন একটি নূর প্রকাশিত হয় যার আলোতে উদয়াচল ও অস্তাচল আলোকিত হয়ে পড়ে।

কোন কোন বর্ণনায় আছে যে, নবী করীম (সাঃ) যখন ভূমিষ্ঠ হলেন, তখন তিনি উভয় হাতের উপর ভর দেওয়া অবস্থায় ছিলেন। তারপর তিনি এক মুষ্ঠি মাটি হাতে তুলে নিলেন এবং আকাশের দিকে তাকালেন। (মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া)

এই হিসাবে হযরত আদম (আঃ) হতে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ মোস্তফা ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান হচ্ছে ৫ হাজার ৩২ বৎসর। আর বিশুদ্ধ বর্ণনা মোতাবেক হযরত আদম (আঃ)-এর বয়স ছিল ৯ শত ৬০ বৎসর। এই হিসাবে হযরত আদম (আঃ)-এর পৃথিবীতে অবতরণের প্রায় ৬ হাজার বৎসর পরে অর্থাৎ, সপ্তম সহস্রাব্দে হযরত খাতিমুল আম্বিয়া (সাঃ) এই পৃথিবীতে শুভাগমন করেছিলেন। (তারীখে ইবনে আসাকির, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক হতে-প্রথম খ-, পৃষ্ঠা (১৯ ও ২০)

মোট কথা, যেই বৎসর ' আসহাবে ফীল ' কা'বা ঘর আক্রমণ করে, সে বৎসরেরই রবিউল-আউয়াল মাসের ১২ তারিখ রোজ সোমবার দিনটি ছিল পৃথিবীর জীবনে এক অনন্য সাধারণ দিন, যে দিন নিখিল ভূবন সৃষ্টির মূল লক্ষ্য, দিবস-রজনীর পরিবর্তনের মুখ্য উদ্দেশ্য, আদম (আঃ) ও বনী-আদমের গৌরব, নূহ (আঃ)-এর কিসতীর নিরাপত্তার নিগূঢ় তাৎপর্য, হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা এবং হযরত মূসা (আঃ) ও হযরত ঈসা (আঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীসমূহের উদ্দীষ্ট পুরুষ অর্থাৎ আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীর বুকে শুভাগমন করেন। একদিকে পৃথিবীর দেবালয়ে নবুওয়ত-রবির আবির্ভাব ঘটে আর অপরদিকে ভূমিকম্পের আঘাতে পারস্য রাজপ্রাসাদের ১৪টি চূড়া ধ্বসে পড়ে, পারস্যের শ্বেত উপসাগর সহসাই শুকিয়া যায়। পারস্যের অগ্নিশালার সেই অগ্নিকু- নিজে নিজেই নিভে যায় যা বিগত এক হাজার বৎসর যাবৎ মুহুর্তের জন্যও নির্বাপিত হয় নাই। (সীরাতে মোগলতাঈ, পৃষ্ঠা-৫) .

সমগ্র সৃষ্টিকুলের প্রতি স্রষ্টার এই যে অপরিসীম করুণা দর্শন তার জন্য মানবকুলে প্রথম তাঁরই কাছে ঋণী। পরবর্তী পর্যায়ে যার মাধ্যমে এই করুণা এল, তাঁরই নিকট ঋণী। সেই মাধ্যম হলো মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), যিনি মানুষকে গ্রন্থ-জ্ঞান শিক্ষা দিলেন, পবিত্র করলেন। সমগ্র মানবকুলই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাঁর কাছে ঋণী বা উপকৃত। কে তাঁকে স্বীকার করল, কে তাঁকে অস্বীকার করল সে-কথা এখানে গৌণ। তিনি সকল মানুষকেই স্বীকার করেছেন, সকল নবীকেই স্বীকার করেছেন, সকল আসমানী কেতাবকেই স্বীকার করেছেন। কাউকে অস্বীকার করার মতো মানসিক দুর্বলতা তাঁর মোটেই ছিল না। যার জন্য সমগ্র জীবনে তাঁর মুখ থেকে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বের হয়নি। তাঁর জন্মদিনে পারস্যের রাজপ্রাসাদ ও বহু রাজা-বাদশার রাজতত্ত্ব কেঁপে উঠল। কারণ সেগুলো ন্যায়, সুন্দর ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না (প্রকাশ্যে কোন কিছুই ঘটেনি। তাই যদি ঘটবে, তাহলে ওই শিশুটি ওই দিনই জগদ্বিখ্যাত হয়ে যেতেন। এবং একজন অতি রুগ্ণা গরীব ধাত্রী মায়ের কাছে থাকতে হতো না।) পূর্ববর্তী নবীগণ সকলেই চেষ্টা করেছিলেন সুন্দরের পথে সকলকে একত্রিত করার জন্য, কিন্তু অধিকাংশই আংশিক সফলতা অর্জন করেছিলেন। তাই সকলের সমূহ উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমন। তাই তিনি ছিলেন সকল নবীর শেষ নবী, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। সকল মানবিক আশা আকাঙক্ষার তিনি ছিলেন মূর্ত প্রতীক। তাই আজও পেয়ে যাচ্ছেন স্রষ্টার এবং সৃষ্ট সকল সৎ মানুষের শুভেচ্ছা আশীর্বাদ “ আল্লাহ্ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন, হে বিশ্ববাসীগণ ! তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করো এবং তাঁকে উত্তমরূপে অভিবাদন কর। ” (কোরআন ৩৩:৫৬)

আল্লাহ্ অফুরন্ত করুণার অধিকারী হয়েও মানুষের জন্য অফুরন্ত করুণার ধারক হয়েও তিনি কোনদিনই দেবত্বের দাবিদার হননি। সবসময় নিজেকে অতি সাধারণ মানুষরূপে পরিচয় দিয়েছেন এবং সকল মানুষকে দেখিয়ে গেছেন সরল সহজ পথ, এককথায় সমাজ জীবনের শ্রেষ্ঠতম পথ। যে পথ সত্যপ্রিয় নর-নারীর সামনে চিরদিনের জন্য উন্মুক্ত। আজ পৃথিবীর বুকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কোটি কোটি উম্মতের অন্তর-আত্মায় আল্লাহর অসংখ্য গুণগান তাঁর চির মাহাত্ম্য চিরদিনের জন্য চির অম্লান। যারা আল্লাহকে ভালবাসেন পিতাণ্ডমাতা ভাই-বোন ছেলে-মেয়ে আত্মীয়-স্বজন ধন-সম্পদ মান-যশ, এমনকি তাদের জীবন অপেক্ষাও সে সব মানুষের এই অকৃত্রিম ভালবাসাই একমাত্র সত্যের অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

লেখক : ইমাম ও খতিব, বিষ্ণুপুর মদিনা বাজার বাইতুল আমিন জামে মসজিদ, চাঁদপুর সদর, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়